শনিবার, ২২ জুন, ২০১৩

খোন্দকার আশরাফ হোসেন : মরণ এমন দেশ, যার ধূম্র আলিঙ্গন থেকে ফেরে না পথিক কোনো

খোন্দকার আশরাফ হোসেনমরণ এমন দেশ, যার ধূম্র আলিঙ্গন থেকে ফেরে না পথিক কোনোখালেদ হোসাইন


ঠিক দুপুর ১২টা ৩৫-এ ফোনটা এলো। করেছে বন্ধু মাহবুব, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান। বলল, 'একটু আগে আশরাফ স্যার মারা গেছেন।' বুঝতে অসুবিধে হলো। আমার সামনে বসা তখন অনিরুদ্ধ কাহালি আর সুমন সাজ্জাদ। আমার মুখাবয়বে নিশ্চয় বদল ঘটেছিল। ওরাও কিছু বুঝতে চাইল। আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য জানতে চাইলাম, 'কে? কখন? কিভাবে?
' আমার বুক ধড়ফড় করছিল। এ সময়টায় এমন একটি দুঃসংবাদের জন্য আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এরপর ফোন আসতে থাকল। শামীম রেজা, মাসুদ হাসান- আরো অনেকের। এই তো সেদিন, ২৭ মে, আমি আর সুমন তাঁর আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার এক মাসেরও কম সময়ে। তিন দিনের নজরুলকেন্দ্রিক অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আমাকে বিশেষ অতিথি করা হয়েছিল, সম্ভবত কবিতামূলক ঘনিষ্ঠতা আর ভালোবাসার টানে। একজন কবি উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ায় আমি খুব খুশিই হয়েছিলাম। কবিদের সম্পর্কে ঔদাস্যের পুরনো সংস্কার এখনো শেষ হয়ে যায়নি, তাই। অনেকেই ভেবে আমোদ পান যে একজন কবি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে যোগ্যতার পরিচয় দিতে পারবেন না। কিন্তু অল্প কদিনেই তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিকতার দুর্গন্ধমুক্ত করে ফেলতে সমর্থ হয়েছিলেন। এ কথা শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করেই জেনেছি। কিন্তু এ কৃতী বা কৃতিত্বের প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল, এমন নয়। সম্ভবত তার প্রয়োজনও নেই। তাঁর সত্তার মৌলিকত্বের জায়গা তা নয়, সেটি কবিতা-প্রাণ তাই। আমরা কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনকেই জানি, চিনি, ভালোবাসি। উন্নাসিক হয়ে ওঠার প্রায় সব আয়োজন তাঁর মধ্যে ছিল, কিন্তু সারল্য আর অকপটতাই তাঁর নির্ণায়ক। আর তাই তাঁর মৃত্যুর সংবাদে আমার প্রথমেই মনে পড়েছে 'হোরেশিওর প্রতি হ্যামলেট' কবিতাটি। এরও একটি পটভূমি আছে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখনই তাঁর 'তিন রমণীর ক্বাসিদা' বইটি বেরিয়ে গিয়েছিল। আমার বন্ধু আমিনুল ইসলাম বাবু সুযোগ পেলেই ওই কবিতার একটি অংশ আওরাতে পছন্দ করত, সম্ভবত নিজের অভিজ্ঞতার সাযুজ্যের কারণেই : তোমাকে বলতে হবে, হোরেশিও, অবিশ্বাসী মানুষের কাছে/আমার দুঃখের কথা- আমি এক বিস্রস্ত তরুণ/গ্রন্থিহীন সময়ের অপাপ শিকার। আমি শুধু সারাক্ষণ/ঘৃণার জটিল জাল ছিন্ন করে অবিনাশী প্রেম খুঁজলাম।
কবিতাটি মনে পড়ার সংগত কারণ, জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিস্থলের যন্ত্রণা বা আনন্দ। এই কবিতার সমুদয় অনুভূতি যেন কবি আমাদের উদ্দেশে রচনা করেছেন : বিদায় বন্ধু। মৃত্যুর তীর থেকে জীবনের সুস্থির প্রতিভূ/তোমাকে বিদায়। তরঙ্গসংকুল অই সমুদ্রের নীল ঊর্মিমালা/ডাকছে আমাকে। তার শীতল আঁচল দ্যাখো প্রসারিত হয়/জননীর স্নেহাকুল বাহুর মতোন। .../মরণ এমন দেশ যার ধূম্র আলিঙ্গন থেকে/ফেরে না পথিক কোনো, ফিরবো না আমি কোনোদিন/তোমাদের রাজপথে তোমাদের প্রাসাদের নিভৃত কন্দরে.../(হোরেশিওর প্রতি হ্যামলেট, তিন রমণীর ক্বাসিদা)
তরঙ্গসংকুল অই সমুদ্রের নীল ঊর্মিমালার ডাকে যিনি সাড়া দেন, না, তিনি আর ফিরবেন না, তা বোঝা যায়, মেনে নেওয়া যায় না। কোথাও পাওয়া যাবে না আর তাঁকে? কিন্তু একজন প্রকৃত কবি কখনো তো বিলীন হয়ে যান না। কবি ও কবিতা একাকার হয়েই তো এক অবিনাশী অস্তিত্বের তুমুল ইশারা। তবে? এরও জবাব আছে তাঁর কবিতায় :
আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নত হও, পাবে,/কামে-ঘামে আমি নেই, পিপাসায় তপ্ত হও, পাবে।/.../পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি অহংকার আমার কবিতা/বিষাদে বিশ্বাসে পূর্ণ হৃদয়ের জলাধারে ধরো,/আমাতে নিবদ্ধ হও পূর্ণপ্রাণ ফলবন্ত হও- /আমাকে পাবে না ফলে, পরাগ-নিষিক্ত হও, পাবে।/(প্রার্থনায় নম্র হও পাবে, তিন রমণীর ক্বাসিদা)
কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক রচিত হয়েছিল আগেই, ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূচনা ১৯৮৩ সালে। কিন্তু অবিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর কবিতা আমার ভালো লাগত। কোথাও ছাপা হয়েছে, চোখে পড়েছে আর পড়িনি- এমন হয়নি। এই কৌতূহলটা জাগিয়েছিল তাঁর কবিতাই, তা অক্ষুণ্ন রেখেছেও সেই কবিতা। আর যার মনের আলোড়ন সেই কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে তাঁর প্রতি আকর্ষণ বোধ করাটা স্বাভাবিক। এমন মানুষ সহজেই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আদায় করে নিতে পারেন। নিয়েছিলেন তিনিও। তাঁর কোনো একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে আমাকে বিশেষ অতিথি করা হয়েছিল, যেতে পারিনি কথা দিয়েও। রাগ করতে পারতেন, করেননি। গত বছর রাইটার্স ফাউন্ডেশন নামের সংগঠনটি আমার জন্মদিন পালন করল ঘটা করে। সবই সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরাই করেছে, আমার তেমন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কাদের আমন্ত্রণ করেছে, তা-ও জানা হয়নি। আমার ধারণা, পরিকল্পনামাফিক আমন্ত্রণপত্র বিলি করা যায়নি। তা সত্ত্বেও আমাকে ভালোবেসে বিভিন্ন জায়গা থেকে যাঁরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনও ছিলেন। ঘণ্টা দেড়েক থেকে আলোচনা করে, কবিতা পাঠ করে গিয়েছিলেন। তাঁর এ মহানুভবতা আমি কিভাবে ভুলব? শ্রদ্ধাতর্পণমূলক লেখায় নিজের প্রসঙ্গ এসে যাওয়াটা লজ্জাকরই। কিন্তু এ তো আমারই দেখা আর বোঝা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে আমি তো এগোতেই পারছি না। কিন্তু পাঠক, ভেবে দেখবেন, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে আমার কথা বলছি, সেখানে আমি নেই, আছেন ভালোবাসার সেই কবি আর মানুষটিই- খোন্দকার আশরাফ হোসেন।
দৃষ্টি আর অভিব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যই কবিকে সামাজিক মানুষ আর অন্য দশজন কবি থেকে আলাদা করে তোলে। স্বভাবতই কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের কবিতায় প্রাতিস্বিকতা সহজভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে। বিস্তারিত আলোচনার চেয়ে একটি নজির হাজির করা বরং ভালো : টিভি এন্টেনার সহস্র আঙুলে লাল/নোখপালিশ পরে নিলে/দূরের আকাশে সন্ধ্যা নামে/লেকের জলের মধ্যে খেলা করে সোডিয়াম আলোর শহর/পোশাক শিল্পের ঐ নারীকুল তখনো সীবনরত/জ্বলে ওঠে বালব, তার নীচে/সূর্যালোক, প্রজাপতি তার নীচে তিন শ' তেত্রিশজন নারীর যৌবন/তার নীচে হলুদ ঠোঙায় রাখা দুপুরের বাসি লাঞ্চ/তমাল তরুর গন্ধ চুলে নিয়ে বন্দিনী শ্রীরাধা/বাটনহোলের ফাঁকে গেঁথে যায় কদম্বের ফুল।/(পোশাক শিল্পের শ্রীরাধা)
মানবজীবনে দুঃখের শেষ নেই, সুখ তাই এত আরাধ্য। কিন্তু দুঃখেরও তো স্বতন্ত্র স্বাদ আছে। অন্যরা তা এড়িয়ে চলতে চাইলেও কবি তা চান না। কারণ প্রথাগত পথ কবির জন্য নয়, সর্বপরিব্যাপ্ত আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে ঔদাস্যপ্রবণ ও সাহসী- এই বিমিশ্র আবেগে উন্নীত করে দেয়। প্রগাঢ় অভিমান তাঁকে সুন্দর করে তোলে। তা না হলে কবি কিভাবে বলতে পারে : দুঃখের কেমন স্বাদ কী করে জানবে তুমি, বলো?/এই আমি সারা দিন দীর্ঘ রাত দুঃখের বিষম ফল খেয়ে চিবুতে চিবুতে/ হেঁটে যাচ্ছি, তুমি জানবে না কি প্রশান্তি এর/নম্র শঁাঁস ত্বক আর অন্তর্লীন বীজে।/(লাবণ্য আমিই জয়ী, তিন রমণীর ক্বাসিদা)
কবিরা দুঃখেরই বরপুত্র। রবীন্দ্রনাথ এ জন্যই বোধ করি বলেছিলেন, 'অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন তার বক্ষে বেদনা অপার।' সংযুক্ত থেকেও যেন বিযুক্ত কবি। আর বিযুক্ত থেকে সংযুক্ত। গড়পড়তা সামাজিক মানুষ থেকে এভাবেই তিনি আলাদা হয়ে যান, সমাজস্থিত থেকেও। হয়তো এটাই তার আনন্দ, এটাই তার বিষাদের কারণ। আর অনন্যতার। কিন্তু জীবনের শেষে কী নিয়ে চলে যান তিনি?
কী খুঁটছ সারা দিন অনন্তের পাখি?/খুঁটছি যবের দানা, শস্যবীজ, খুঁটছি জীবন।/.../কী নিচ্ছ ঠোঁটের ফাঁকে, সুদূরের পাখি?/আমি নিচ্ছি দুটো খড়, এই মৃত্যু, আরেক জীবন।/(সুদূরের পাখি, তিন রমণীর ক্বাসিদা)
ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আবার যেতে হচ্ছে। ২৭ আগস্টই কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এর পরে কথা হয়েছে টেলিফোনে, দেখা হয়নি। দেখা হওয়ার পর চা খেতে খেতে আমি সুমন সাজ্জাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললাম, 'ও কিন্তু আপনার ভীষণ ভক্ত। আসার সময় আপনার কবিতা শোনাচ্ছিল স্মৃতি থেকে।' একটু হেসে বললেন, 'কোন সে দুর্ভাগা কবিতা?' সুমন লাজুক হেসে বললেন, "ওই যে 'তোমার নামে বৃষ্টি নামে' বইয়ের- 'বৃষ্টি' : যখনই খুঁজেছি মেঘগরজনে তোমার পায়ের শব্দ/তুমি নও শুধু বকুল গন্ধে বৃষ্টি এসেছে।" তিন দিনের নজরুল-অনুষ্ঠান শেষ করার পর তিনি আমাকে বললেন, 'খালেদ, আপনি আমার অফিসে চা খেয়ে যাবেন। ওরা আছে, দেখবে। আমি একটু বাড়ি যাচ্ছি। একদিন যা ধকল গেছে, বলে বোঝাতে পারব না।' হ্যাঁ, কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের বাড়ির প্রতি আকর্ষণ আর আকুলতা ছিল, পূর্বাপর। অনেক আগেই তিনি তা জানিয়ে রেখেছিলেন : বাড়ি যাবো, বাড়ি যাবো, বাড়ি.../পথ ছাড়ো অন্ধকার, পথ ছাড়ো দূরত্বের দূরগামী পথ/বাড়ি যাবো, বাড়ি.../('বাড়ি যাবো, বাড়ি', তিন রমণীর ক্বাসিদা)
'তোমার নামে বৃষ্টি নামে' বইটিতে কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন আমাকে লিখে দিয়েছিলেন, 'আমরা একই পথের যাত্রী'। তাই খুব ভয় হয়। কবে, কখন আমিও দূরত্বের দূরগামী পথ বেয়ে বাড়ি চলে যাই- এই ভয়। বাড়িতে তো যেতেই হবে। আরো কিছু দেখে বাড়ি ফিরি!

http://www.kalerkantho.com/print_edition/index.php?view=details&archiev=yes&arch_date=21-06-2013&type=gold&data=news&pub_no=1280&cat_id=3&menu_id=81&news_type_id=1&index=1#.UcW-8tJ-GhQ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন