শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০১০

সৌম্য সরকার

সৌম্য সরকার


অনেক দেখিয়াছি


অনেক দেখেছি আমি-- বলতেই একটি তৃতীয় শক্তি এসে জেঁকে বসে

আমারে জিগাইল-- কী; কী দেখেছেন ভাই? হেক্টর বা মেঘনাদের পরাজয়?

নাকি একলব্যের কাটা বৃদ্ধাঙ্গুলি? অথবা ডাইডোর শোক! ‘ইকারুসের আকাশ’!

আমাকে অস্বীকার করতেই হলো: না রে ভাই, ওসব তো হোমারেরা দেখেছেন--

তবে তবে! ‘বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ’?

কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম


আমাদের কিছু ঘাস ছিল


আমাদের উঠোনের কোণে কিছু ঘাস ছিল

আমাদের নিঃশ্বাসে ছিল নির্ভার নদীর কলতান;

ঘরে ঘরে ঘোড়াদের কাল শেষে ফিরে আসে আস্তাবল

তাদের স্মরণে আসে অন্ধকার-- স্মৃতির ঘাসে নূপুর বাজে শোন:

আমাদের কিছু ঘাস ছিল-- ঘোড়ারা ঘাস খেত

ঘোড়ারা ঘাসহীন দলে দলে

ঘাসের পরানে বাজে শূন্যতা

ও ঘাস, ও শূন্যতা, তোমরা আমাদের উঠোনে আজো

বিবিধ তৈজস--

জহির হাসান

জহির হাসান


মরিয়ম বিষয়ে পদাবলী


বাজারের ব্যাগ কোথা গেল, বৃষ্টি হচ্ছে, বাইরে যাবো,

মরিয়ম কই, তজবিদানার মত বৃষ্টি ঝরে, মনে, যথাতথা,

উনুনে বসানো ঠান্ডা বেগুন তরকারী, বেড়ালে কি মুখ দিয়েছিল ওতে?

আমি নাহি গো কোথাও প্রতিসরণের মধ্য দিয়ে পৌঁছে যাবো

বাউলা চুলা তেমাথার গাছের নিকটে, দেখি তাকে কিছু বলা সাজে কি না,

যদি চলে যাইতাম তাহার চিরহেফাজতে, তার ছায়াটি হইতাম মন চায়!


পানডুবি সাথে ছানাপোনা দেখিছি বর্ষায়, তার কাছে যাবো, যদি ভাসতাম,

যদি অনায়াসে একবেলা সঙ্গী হই সরপুটির মতন খোকার, হাতে রৌপ্যবালা, বড় হাউসের,

আজ আমার কী হলো কত হাউ হাউ বোতল মাতাল সমীরণ কোন দেশে ছুটে যাচ্ছে,

মেঘের কিনারে ঠাঁই পাওয়া রোহিনী তারার মতো কেউ পাহারাদার ডাকিছে

লিচ্ছবি বংশের মেয়ে, হূণ আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়ে

পালিয়েছে স্বাতী বিশাখার আশেপাশে,

এতসব প্রশ্নকর্তা কোথায় থাকেন?

হাওয়া সরে যায় লেবুবনের নিকট দিয়ে পুকুরপাড়ের তুলা গাছের ওপর দিয়ে

দ্বৈত সত্তা উড়ে যায় বুদ্ধি ও বিবেকসহ ছন্নছাড়া

আর অন্ধকার বৃদ্ধ দিন বৃষ্টি পড়ে গুপ্ত যুগ থেকে অনিবার্য রয়নার বনে,

মরি, হায়, বাজারের ব্যাগ কই থুইলা!


আম্মার চৌকির নিচে মশার কয়েল জ্বলে কেন, তেলচিটে বালিশ বিছানা মাতা-মাথা শুয়ে আছে,

আঙুল ফাড়ায় নুনপানি ঢালো, বলি, যেন আজ দূর্বার উপর

মরে পড়ে আছে বিষহারা ঢোঁড়াসাপ, বলি আম্মা, পান, সুপারি, মিঠাই

আর কিছু, ইনি স্বামীহারা, ইনি যজ্ঞির ডুমুর খাওয়ায়ে দুপুরের চাল বাঁচায়েছে,

সেই প্রহসন করে নাই পুরোপুরি দিশাহারা, আজ তবে বাহিরে আহারে নিমন্ত্রণ,

পরমায়ু বাড়ে ছাগলের দুধ খেলে কী কী রোগে সেরে যায়, কেন জানিনি জড়ায়ে জিওলগাছে ওঠে আলকুশি লতা প্রেরণা বাৎসল্যে বিড়াল যেভাবে নিজ বিষ্ঠা ঢেকে তাড়হুড়া চলে যায়,

যেতে হবে,

বাজার বহিয়া যায়, দেরি হয়ে যায়, ঠেকে গেছি, বখে গেছি,

আজ টাকা নাই কাল টাকা হবে অর্থের হায় রে স্থির অর্থ নাই ক্যানে,

কে মুছায়ে দেবে বাছুরের মুখে দুধফেনা লেগে আছে,

মরিয়ম, ঘুম থেকে ওঠো, বাজারের ব্যাগ আনি দাও!


#

মানকচু ছেঁড়া কলাপাতা, শরীফের ছাতা, কিবা কাজে লাগে, এই ঘোরলাগা গৃহবন্দী ধন্দলাগা

কিছুকাল এই বাদলায় না গো তোতলায় মোর জিহ্বা,

কোন উছিলায় কমে যাচ্ছে উবে যাচ্ছে কাকে বলি নিজ উতলা ভাবনা,

সংশয় সান্ত্বনা জ্বরো রোগী দেখে জানালার থেকে দূরে আমের আঁটির গায়ে মৃদু গন্ধবহ আঁশ,

নরম হলুদ

কৃষকের হস্তচ্যুত শস্য পণ্য নামে বাজারে ও হাটে ভয় দেখায় কঠিন দোকানে দোকানে প্রাণ

শুকায় শুটকির মতো, নাই খানাপিনা, ঠেলিয়া দিয়াছো নানা রং

দজ্জাল, আকাল, মনের ভেতরে তবু কত ঘুড়ি ইন্তেকাল ক’রে বেঁচে আছি,

দূর থেকে খেলা দেখো আজ যার যার তার তার সেই সে টানাপোড়েন

অম্বর কহিছে, হায়, তোমাকে আসতে হবেই

জামরুল গাছের তলায় পোতা আছে অগাধ এলেম,

মরিয়ম, তুমি কোথা, চলে গেছো রাত্রির কবলে,

ওঠো ন’লে প্যাঁচ বেঁধে চুকা হইয়া যাবে মোগো লেনদেন,

বাজার তোমারে ডাকে, নমাজ তোমাকে ডাকে, বাজারের ব্যাগ রাখিছি কোথায়?


গোয়ালের পিছে বিদেহী বনবিড়াল আছে খোয়াড়ে কাঁপছে মুরগির মন গরম শরীর

চোখ লাল, ওগো আমি তোমাদের নিকৃষ্ট মনিব, ওগো আজ আতরের শিশি থেকে

কেরোসিনের গন্ধ আসে, অবলা নির্বোধ আকৃতির প্রশ্ন আসে মনে,

যেন কূটবাক্য প্রসব করিব আজ এইক্ষণে জেদী লিঙ্গ পুঁজিপিতা আপনি থামেন,

দারিদ্ররেখার নিচে ঘুমায়ে পড়েছি ঠুনকো সম্বলহীনা ব্রাত্যজন,

যদি ভাবো মাকড়শা জালে শিশির কণার মতো ঝুলে আছি,

কেউ খাবে কেউ খাবে না তা হবে তো না,

পাবনার পাগল মিলন বলে, ডাল নয়, এইডা তো ঘাটের পানি,

পাগলা গারদে যাবো, বেঁচে যাবো, উৎকণ্ঠায় পাগল দেখাবো পাছা

ফটোতোলাদের দিকে, নিরক্ষর হবো এ-জীবনে একদিন জানি সানকিতে ফ্যান নাকি পানি

নাকি কুড়া বুঝিব না কেন আজ মনোসন্ধ্যা, কেন মন দরুদ শরীফ পড়ে

মরিয়ম, জানি না বুঝি না আমি কোন্ বাজারে যাবো?


সবাই নমাজে গেছে আমার কি হবে, ঝরে নষ্ট ছবেদার ফল,

অন্তরে যে আশা করে বাসা,

অন্তরে তা নেচে-কুঁদে ধসে পড়ে,

জীবন চরমে ওঠে ফলে কতবার গেছি হরিতকি বনে

তবু পাই নাই সেই অগাধ প্রশান্তি, ছায়াতলে কান পেতে শুনি, গাছ মোরে বলে,

‘নিরাশ্রয় রতা, কোনোভাবে প্রাপ্য তোমার এ ডাল তোমাকে দেবো না।’

রাগে ক্ষোভে কান ধ’রে বলি,

এর বীজ পোড়াও ক’তেছি, পরে

কঠিন বঙ্কিম বিষবৃক্ষ হবে, তার ফল

ভুলে অকারণে হিলে ফেলবানে,

ফলে শুয়ে থাকি যেইরূপ চরম ঘাপান খেয়ে পালোয়ান

শুয়ে থাকে গাবতলে, কি কবো হয়নি তাতে নিবিড় বিশ্রাম,

মনে হয় পড়ে থাকি সেই রূপ থেমে পড়া বিকশিত লেনদেন,

মোরব্বার কোনো চাঙ যেন,

ওশে ভেজাপেঁচা তেতুঁলের ডালে বসে দেখে এই সব,

এবার মন চায় বিষুবরেখাটা ধরে চলে যাবো মধ্যাহ্ন সকালে

দিশেহারা বাঁকা পথে জাহাজে টাহাজে করে গাভীন গরু চরা মাঠে,

জ্ঞান ফেরে যেই মনে আসে,

মরিয়ম, বাজারের ব্যাগ কনে গেল হায়!

আবদুর রাজ্জাক

আবদুর রাজ্জাক


রিংটোন


এই যে এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে নদীময় বাঁক,

তার নামের নদী, বরফগলা সন্ধ্যার আলো

নৈরাশ্যের নিঝুম বিকেল, শীতের পিছনে আসা

বসন্ত সখি, আর সুগন্ধ দ্বীপের থেকে আসা

নীল কালো হাওয়া,

তুমি যদি আসো সুগন্ধ দ্বীপের দিকেই এসো,

হাওয়াবদলের নামে তোমার সাথে

দেখা হতেও তো পারে?


স্বপ্ন আছে বলেই মাটি ও মানুষ তা বিশ্বাসে আছে,

শীতমুদ্রার মৌনস্রোত আছে নদীময় গানের অন্তরে।

মানুষের সকল আকাক্সআ ছিন্ন করেই হেঁটে যায়

নদীময় বাঁক, রেখে যায় স্রোতচিহ্নের গভীর রেখা,

বেহালা বাদকের সুর প্রস্রবণের ডাক


নদী যে দিকেই যায় সে দিকেই বাঁক নেয় জল,বাঁক

নেয় ঘাসময় চোখ, আঁকাবাঁকা ঠোঁট, নারীর চোখের

মতো অজস্র বৃষ্টির ঢেউ, মোবাইল ফোনের

ছন্দগাঁথারিংটোন যত

নদী বলতেÑ থমকে থাকা নদীরই নানা প্রশ্নকথা,

ক্রমশ উজাড় করা জলকণাপাঠ


তার নামটা যে ভুলেই গেছি


বৈশাখের তীব্র দিবসে আমার রাধা

আমাকে ছেড়ে বনবাসে যায়,

তার মেঘ, ভাগে ভাগে ভাগ করে আমার

আঙুলের ডগা,

কোন্ পিপাসা নিয়ে সে, ঝড়ের বেগে ফিরে

এসে কড়া নাড়ে বারবার

যেন এক সৃষ্টিছাড়া চপলবালিকা দাহ করে তার

স্বচ্ছ প্রেম, আর আমার অঙ্গনে রেখে যায়

ঘরগেরস্থালির একমুঠো অমা,

অধীর আত্মা থেকে ধার করা ছায়া


সে আসে ভিন্ন মেঘে, গন্ধবিভাবে, ঝড়ো হাওয়ার

ক্রমাগত উচ্ছাসে, ধুলোর পুলক সন্ধানে,

প্রার্থনা করি বোশেখ আসার আগেই যেন ফিরে যায়

সে, যেন তার আনন্দ হরষে আসার দীর্ঘশ্বাস

আমাকে বিব্রত না করে


তার খরা জীবনে আমিই প্রথম এক রূপালি ইলিশÑ

চকচকে রোদ, পিপাসা সিঞ্চনের তীব্র হাওয়া,

শতাব্দী কাল ধরে দাঁড়িয়ে দেখা মেঘচারী নদ


অপেক্ষার শেষ সীমান্তে এসে দেখা আসন্ন বৈশাখ

রনক মুহম্মদ রফিক

রনক মুহম্মদ রফিক


মেঘবরিষণ ঢালে স্নিগ্ধ অধ্যাপিকার শাড়ি


আমার তাবৎ প্রেম ভেসে যাচ্ছে মেঘবতী জলে; মহাকাশে অভিশাপ তিলশর্তে খুলে পড়ে পাখিদের ডানা।

তুমিরূপ মহামায়া করতোয়া নদী বুকে মেঘ ভেসে ভেসে; ঘ্রাণ ঢেলে দেয় স্নিগ্ধ অধ্যাপিকার শাড়ি ...

শাড়িটায় মহাকাশ,Ñ

নীলাকাশে যতেœ মোড়া সলমা জরিতে দীপ্ত মাধুরী বুনন

হাতঘড়ি মৈথুনে যান অধ্যাপিকা; দেখেন চুম্বক চোখে সহোদর তিন কাঁটা

গোলক কাচের ঘরে বাস করে শূন্য বিন্দুতে ... কাজে কর্মে স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল:

জঙ্গী কাচের মেঘ, সারাক্ষণ বৃষ্টিপাত মাথার ওপর

শূন্যে ভেসে যান প্রিয় অধ্যাপিকা ...

তাঁকে যত ভালবাসি, ছুঁতে গিয়ে স্পর্শ-রোদে পুড়ি

প্রাণপঙ্কে হানা দেয় দ্বিধালগ্ন এসে। তিনিও বাড়িয়ে দেন হাত

প্রোটন ঘূর্ণনে তার আরো এক সঙ্গী আছে প্রহরী চেতনে! ধ্র“ব ভার্নিয়ারে তিনি দূরে

অবস্থিত ... হঠাৎ শিরায় রক্ত, স্পর্শে কেঁপে ওঠে, স্পর্শমোহে টের পাই ফণিমনসার কাঁটা

বিস্ফারিত তীর, উঁকি মারে চুম্বনের ডালিম কর্নারে! রঙ ও রঙ্গে সর্বকাল মহৎ সজারু যেন

ফিরে পেল গৃহ ব্যালিন ...

ডালিম ফাটে না তবে রসদানা ফাটে : ছিনতাই হলে ভ্রƒণ মাতৃত্বেই বাড়ে : এই যে আমি তপ্তক্ষত

রেণুÑ বিচ্ছেদ বিন্দুভেদী ব্যাস ভিন্ন ব্যাসার্ধকে গিলেÑ একাই এঁকেছি আমি রমণ জ্যামিতি!

: এই যে অধ্যাপিকা, (?) তোমার ত্রিভুজ কানন বায়োটেক বিক্রিয়া বোঝে না

: এই যে স্নিগ্ধশাড়ি, (?) বরিষণ ঢেলে দিলে প্রেমিকের যে কোন ফাল্গুনে

তার গড়া বনানীতে করাতের ছিন্নশব্দে, Ñ প্রেমিক মিস্তিরি বাবু ওমেগা পাখির ডাক

করাতেই কাটে ...

অধ্যাপিকা রেগে গেলে অথৈ বর্ষা নামে তালদিঘি পাড়ে! শাড়িতে শাড়ির মর্মে সুতো মুখে

ঝগড়া করে পিয়াসী চাতক! চাতক চায় না কোন অন্ন পানি, অন্য রাঙা জল; Ñ

পিপাসিত ডানা ঠোঁট কালিক বিরহী ...

মেঘ আছে দূত নেই, অধ্যাপিকা শাড়ি তলে রূপরেখা বুনে যায় বর্ষা মঙ্গল।

পাহাড়ের চূড়া ধরে যখন হাসেন অধ্যাপিকা, আমি অন্ধ চাই নিতে শাড়িমেঘ বরষা

সুষমা : হিমালয় থেকে আসা গতরের ঘ্রাণ ...

মহাকাশে উড়ে উড়ে সকালিক মেঘমালা অধ্যাপিকা জড়িয়ে নিলে গায়,

মেঘবুকে আমি হই ক্ষুধাতুর প্রণয়ী পাইলট ...

..........


আমার অধ্যাপিকা থাকে দূর শহর পাড়ায়

স্বপ্নচোখে দেখি তার শাড়ি ওড়ে সুতোর আড়ায়

বারান্দায় দোল খায়, কোনো সুতো শোভাশূন্য নয়

সলমা জরির কাজ পাড়চিহ্নে তারকাখচিত মনে হয় ...

আমার অধ্যাপিকা শাড়িরূপ মেঘবক্ষেÑ একটুকরা আলোকিত চাঁদ

ভ্রƒবিলাসী চোখ আর নয়ন পটলচেরা, সুহাসিনী ফাঁদ

সে ফাঁদেই নিবেদিত সৌন্দর্যকে অধ্যয়ন করি

যে রূপের পাঠ্যসূচি ভুবনের বিদ্যালয়ে পড়ি

সুবোধ ছাত্র আমি

আমাদের শ্রেণিকক্ষ নেই

পঠনপাঠন সব

একাগ্র চিত্তে থাকে, থাকে অন্তরেই ...

তাবৎ বর্ষণগীত, শাড়ির সুষমা আমি প্রতিদিনই পড়ি

হয়তো ঘুমের ঘোরে, শাড়ি বক্ষ তুলি দিয়ে ভরি

আমার অধ্যাপিকা হেঁটে গেলে বর্ষণের রাত

ভর করে শাড়িশুদ্ধ, সীমাহীন ছন্দ বারিপাত

কী রঙে সাজাতে পারি, শুধু ঐ রঙধনু জানে

যখন বাসন্তী-ধারাÑ তাকে আর শাড়ি ধরে টানে

আমি তার দেহ, রং, শাড়ি, সুতো মুখস্তের মত

একা মগ্ন পড়ি বসে; যেন ঋষি ধ্যানে অবিরত

তার জোড়া পামসু-খানা যদি তোলে শব্দ অলঙ্কার

বর্ষামাস শেষ হয়, খুলে যায় বসন্তের দ্বার

প্রতিপাদ্য অধ্যাপিকাÑ আমি তাকি সুরে, তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে

সকল রাগের স্বরে মিলে মিশে একাকার, গায়কী ভঙ্গিতে

কে তার মুগ্ধ শ্রোতা, শুধু জানি বুকের কৈলাসে

আসে আর ফিরে যায়, জানাজানি হয় না তো উতল উচ্ছাসে


যখন তুমি প্রথম দৃষ্টি হানো

অবলোকন ছিল প্রথম থেকে

আমার ছিল এক পক্ষ টান

হৃদয় ছিল অন্য দিকে বেঁকে


প্রথম দেখা প্রথম শাড়ির ঘ্রাণে

চোখ ফিরিয়ে খেয়েছিলাম খাবি

মাছের মত ভয় ছিল খুব প্রাণে

তাই তুলিনি জড়িয়ে পড়ার দাবি


এখন আমি মড়া নদীর ঘাট

ভাঙা ডিঙি এপার ওপার করি

বুকের ভেতর সমস্ত তল্লাটে

বালিয়াড়ি, যায় না বাওয়া তরী ...


এষণাপক্ষ


চাইলেই পারো Ñনদী : আমি দেশ প্রজন্মে গৃহমুখি,

খনন করতে পারো নীলসীমা বঙ্গোপসাগরÑ

তুমিই যেখানে একা আঙুলে কাটতে পারো জলের উল্লাস

চাতক সখ্য ঋণ পরিশোধ করে ...


চাইলেই পারো প্রেম : তাবৎ মেঘের তুলো, আর্দ্র সামিয়ানা

মাথার ওপরে পারি গুটাতে বর্ষণ,

সকল বৃষ্টিপাত : বর্ষার আশ্রয় অন্য রাজ্যপাটে

প্রশ্নই ওঠে না ...


চাইলেই পারো মন : তারাপুঞ্জ পাটসারে

গুটিয়ে প্রভাত আগে, গুণে গুণে গেঁথে দেব

অলকা তিলকা ক’রে ব্যক্তিগত মনোহারি টিপ...

চাইলেই পারো গৃহস্থালি : চালচুলো হেসে উঠবে

আমাদের রান্নাঘরে ...

সূর্যোদয়ের আগে ফোঁটা-চোঁয়া জল ছেড়ে

অনার্য শাড়িখানি বায়ুমন্ত্রে উড়বে বারান্দায়,

প্রতিবেশি টিটকারি, লাজ পদাবলিÑ ছড়িয়ে গড়িয়ে তবে;

জানাজানি হয়ে যাবে কলঙ্ক বাজারে ...


চাইলেই পারো শস্যকণা : নিষ্পাপ এক ঝাঁক পায়ের আঙুল

পোতনে-উঠোন ধারে

ঘুরপাক কাবে ক্ষুদ্র, আলতা সঙ্গীতে

মুঠো মুঠো মাটি চুষে দাঁতহীন জিহ্বা আড়ালেÑ


চাইলেই পারো প্রার্থনা :

হাদিসের কালো স্বর ব্যঞ্জনধ্বনি, তসবি পাহারা আর

তোমাকে রাখবে ঘিরে বোরকাহীন তনু

উদার প্রকাশ্য ধ্যানে, অধরা আলোক এষণায় Ñ

সুদূরের মাদুরীয় ওম, প্রার্থিত সুরের প্রথমা

ছুটে আসে এই বোধিদ্রুমে; প্রেমিক উন্মত্ত ক’রে যাবে

রাবেয়া বসরীর অনুরাগে ...


বিহঙ্গ বৃক্ষকীট : পতঙ্গ পাখিরা

দেখবে সুবর্ণ বীথি, জন্তু মনিব যত, যত হিংস্র হাতি

গাছেরা সরিয়ে নিয়ে ছায়াÑ ঢালবে আলেয়া ঝর্না সুখ

দূরে শুধু আমি দেখবো : মেঝেয় গড়িয়ে আর্দ্র আলেয়া ঝলকানি ।

সরোয়ার সবুজ

সরোয়ার সবুজ


আমিও পাথর হবো আমিও শ্রাবণ


আমিও পাথর হবো, আমিও শ্রাবণ। জ্বলে জ্বলে খাক হবো, জমে জমে হিম

শ্রাবণের বারিধারা অজস্র অলীক। স্বপ্নের বৃত্তভেদীÑ নৃত্যময়ী গান

রমনার বটমূলে, স্মৃতির চূড়ায়Ñ অপরাজেয়্


যেদিন প্রথম ভোরে ডেকেছিল দূত: হিমাদ্রি আঁধারে, সেদিনও স্বচ্ছ ছিল

এমনই শালীন। বৃন্দাবনে রাধা ছিল Ñ কৃষ্ণ মথুরায়

শ্যামার অত্যঞ্চল সঘন বয়ানÑ মহিমার চঞ্চুভেদী তড়িৎ কম্পনে ...


হিমাদ্রি, হায়, হিমাদ্রি! তন্দ্রা অতল, বৃক্ষের বাকল আচ্ছাদিত

কৃষ্ণ গহ্বর। আভার আবীরে লিপ্ত দশমী বিকাল

শান্তনু সেদিনও আকুল, থই থই বুকÑ শিলাখণ্ডে পৃষ্ঠলেহিÑ

সলিল সঙ্গমে। গোড়ালি তবুও সজীব, শুষ্ক বশংবদ।

সুরলোক সুরাবর্তে উঠেছিল কেঁপে...


আমিও হিমাদ্রি সেদিন, অচিন আঁধারে। তাণ্ডবেÑ

হোল হোলি আচানক ভোর। সুগম বায়ুধার ধূসর মলিন,

গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি কাঁপেনি ব্যাকুল নিভন্ত শিকার কি কঠিন সাঁতার

শত্র“র পদভারে প্রকম্পিত ভোর । রতœাগারে রতœ নেইÑ পড়ে আছে স্থবির

লুণ্ঠিত, ছিন্নভিন্ন; সৃষ্টির অপূর্ব কৌশল ...


অতঃপর বুলেটবিদ্ধ বুক-সংজ্ঞাহারা আমি। সহসাÑ

সচেতন হই শ্রবণেÑ যখন বুকের উপরে হিম শীতল লৌহদণ্ডের

স্পর্শে বলেছিলÑ‘তুম্ কোন হ্যায় ?...’

সৈয়দ তারিক

সৈয়দ তারিক


একগুচ্ছ কবিতা


পুষ্পেরা


রজনীগন্ধা উঠলেন রেগেÑ

শেফালি আমার প্রেমিকা কেন!

অপরাজিতার ভাবে মনে হয়

একা হতে চান নায়িকা যেন!


মল্লিকা, জুঁই জবা ও গোলাপ

হতে চেয়েছি তো সবার সখা,

প্রিয় মুখগুলো অভিমানে নীলÑ

ফেরে রেখে যান আমাকে একা।


সদানন্দ


তোমার চরণে আমি চপ্পল

আমার হৃদয়ে স্পন্দন তুমি,

রঙধনু-আঁকা তুমি নীলাকাশ

আমি পায়ে-হাঁটা মর্ত্যভূমি।


তুমিই পরম শুদ্ধ নিবাস

আমি জীব আমি স্পর্শযোগ্য;

তুমি, সুদূরের প্রজ্ঞানন্দ

আমি শুধু প্রেমে তোমার ভোগ্য।


কম্পন


পায়ে নূপুরের শবদ তুলে সে হেঁটে এলো

নিতম্বে গূঢ় হিল্লোল তুলে গেল সে ফিরে,

ঈশ্বর এক মহাতরঙ্গÑ

আপন রাজ্য আপনাকে দিয়ে রেখেছে ঘিরে।


কামনার ঘোরে ডুবে ভুলে যাই চেহারা তাঁর,

কামনায় নিরাকার সে জাগে,

নিষ্কামনার স্তব্ধ হ্রদে সে নীল শতদলÑ

ঢেউয়ে ঢেউয়ে তাঁর কাঁপন দেখতে দারুন লাগে।

শবরী


লুই পা যখন যোগিনীর কোলে

খুঁজে নিয়েছিল নিবিড় নিলয়

ফিরে পেয়েছিল আপন সত্তা

আপনাকে করে পূর্ণ বিলয়।


শবরী আমার লীলাবিহারিণী

আমাকে নাচিয়ে বেড়ায় ছুটে,

হাজার পাপড়ি মেলে মায়াফুল

জানি না কোথায় রয়েছে ফুটে।


ডোমনী


সরহপাদের সে কালো ডোমনী

হয়তো-বা খুব নিকটে আছে

হাত বাড়ালেই যেন যাবে ছোঁয়া

টেনে নেওয়া যাবে বুকের কাছে।


তবু চোখ মেলে দেখি না তো তাকে

মন শুধু তার বিরহে কাঁদে,

জন্মান্তরে ছিল অভিশাপÑ

এ-জীবন কাটে মায়ার ফাঁদে।


বয়স


শিউলি-শিশির-ভোরে ভাবতামÑ

কবে বড় হব বাবার মতো,

খর রৌদ্রের দুপুরে ভেবেছিÑ

স্নিগ্ধতা যদি আবার হতো!


অপরাহ্ণের ছায়া নেমে আসে

ভাবনাবিলাসে কেটেছে বেলা,

বসে আছি চুপ নম্র পাথর

আমার সকল মিটেছে খেলা।



নাচ


ধ্যানবিন্দুতে হঠাৎ যখন

নেচে উঠেছে সে দিব্য কিশোরী

তুমি কি তখন পাল্টিযে কায়া

মেতেছ লীলায়, ও সুরেশ্বরী!


নাচতে নাচতে নাচতে মেয়েটি

হঠাৎ যখন হয়ে গেল নেই

চোখ খুলে দেখি আদ্যোপান্ত

নাচিয়েছ তুমি মাস্ত্ আমাকেই।


ঈগল


নিঃসীম দূর নীলিমায়

উড্ডীন ঈগল পাখি

দুপুরের গোসল ভুলে

অপলক তাকিয়ে থাকি।


সে তাকায় আমার দিকে

আবেগে পাখনা নাড়ে,

পারি না উড়তে আমি

সে নেমে আসতে পারে।


উল্টাসাধন


যে জানে উল্টাসাধন

সে চেনে এলদোরাদো

যে ছেঁড়ে আমি-র বাঁধন

পায়ে তাঁর লুটিয়ে কাঁদো।


যে ছাড়ে মায়ার আদর

চোখে তার দিব্য আলো,

সে আলোর পুণ্য সে পায়

যে বাসে কেবল ভালো।



এবার একটু


এবার একটু নিবিড়ে যাও

এবার একটু শান্ত হয়ে বসো

এবার একটু

এবার একটু মগ্ন ভালোবাসো।


এবার একটু শূন্য হও

এবার একটু নগ্ন হয়ে নাচো,

এবার একটু

এবার একটু মৃত্যুলোকে বাঁচো।

যুবক অনার্য

যুবক অনার্য


খুব মেঘ ক’রে আসে


সলতেডাঙার ধারে মুহূর্তের অলিখিত শোক

বিবর্তিত ঘাসের নগ্ন পরতে ফড়িঙের ব্যথিত উৎসব

পাখিদের বারোয়ারি সঙ্গম পিছপা হয়ে আসে

আর অই রোদের রাখাল যে কখনো ভুলে যায় না

তার প্রিয় কোনো নাম, সেও বিষণœ যেন কবি


পথচারী জোনাকির সাথে জোছনার

অথবা নির্দলীয় নক্ষত্রের

বিধিবদ্ধ প্রেমের মধ্যে নেমে আসে

ধূর্ত ইয়াগো-সন্দেহ ওথেলো-রুমাল


তুমি চলে গ্যালে কবিতায় খুব মেঘ ক’রে আসে

তারপর দীঘির প্রথম জলের আশ্চর্য মহাপ্রয়াণ


তুমি চলে গ্যাছো, তাই ছত্রভঙ্গ বারোমাস


অসমাপ্ত অটোবায়োগ্রাফি


প্রজন্ম পেরিয়ে যাওয়া অভিধান

এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রস্তুতি নিয়ে

নক্ষত্রেরও মৃত্যুু হয়


কোনো কোনো মাঝরাতে বৃষ্টি হলে

নিঃসঙ্গতার প্রতিদ্বন্দ্বী সেজে সে-ও মলাটসর্বস্ব দেয়ালের মত কাঁপে


দেখি নক্ষত্রের মতন তারো চোখে

প্রজন্ম-ডিঙানো ব্যস্ত অভিধান

মৃত্যুর জলছাপ অসমাপ্ত অটোবায়োগ্রাফি


আর্ট এক্সিবিশন


উনুনে শূন্য হাঁড়ি, রান্না হচ্ছে হাওয়া বাতাসের

যেন তৈলচিত্রের চমৎকার প্রদর্শনী


কোথায় তাহারাÑ জয়নুল, লিওনার্দো

এমন দুর্দিনে বিষাদের ঐশ্বর্য

ছলকে ওঠে পাঁজরের বাঁকা হাড়ে

দৃশ্যসংকটে তীর ধ’রে ভেসে যায়

বালিয়াড়ি ঘাস চাঁদের ফসিল


বুঝি নাÑ এখনো সন্ধ্যার সুতো ধ’রে

সকাল কেনো আসে

শাহনাজ পারভীন

শাহনাজ পারভীন


সামীপ্য

হেমন্তের ম্লান নক্ষত্রের মত শীঘ্রই ঝরে পড়বে সবাই।

কত মানুষের কত গুঞ্জন

কর্মব্যস্ততার কত আলোড়ন

সন্ধ্যার অন্ধকারের মত স্তিমিত হয়ে যাবে সব!

ওয়ার্ডসওয়ার্থ, মিল্টন,

ব্রিকলেনের মনিকা আলী, ম্যাক্রিম’রÑ‘মা’

থাকলেও কি, না থাকলেও বাÑনির্ভেজাল দিনের পৃথিবীÑ

সোনায় মোড়ানো রাত, সামারার বৈভবÑ ঝিরিঝিরি ঝরনার গান

ছলাৎ ছলাৎ তান বাজেÑ শোন, মন পাতোÑখুলে দাও কান!

তবু আকাক্সক্ষায় থাকি, আশা বাধি রোজ

শুধু জীবিত নয়, যেন জীবন্ত থাকতে পারি

তোমার সামীপ্য সুধাÑ লাভ করতে পারি আজীবন...


ইন্টেরিয়র

বিলবোর্ডের হোর্ডিংয়ের নিয়ন সাইনে কখনো যায় না দেখা

অন্তরের আলোয় ঝলমলানো সুদৃশ্য চোখ কান নাকসহ Ñ

লালিত স্বপ্নগুলো ডানামেলে পেখম তোলে ;

শৈশবের কবিতা সন্ধ্যা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

অতীতের পদাবলি ভবিষ্যৎ-এর নৈঃশব্দ

বর্তমানের ঝঞ্ঝা রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিক্ষোভ

সন্ত্রাস ছাড়িয়ে কাব্য ভাবনা কাব্যহিংসা আবছা হয় ;

মাথা ছেড়ে ওঠে গার্মেন্টস্ ভবনের দাউ দাউ লেলিহান আগুন।

অলিতেগলিতে অল্পবিস্তর বৃষ্টিতে হাঁটু পানি কোমরপানি।

মহানগরে বসেই স্বাদ পায় নানাবাড়িরÑদাদাবাড়ির

গাঁয়েরÑগ্রামেরÑবর্ষারÑবন্যারÑনৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের

কষ্টেরÑদুর্ভোগেরÑআনন্দেরÑঅনাদি বাংলার।

ও ভরা বর্ষার খালবিল ছইতোলা নাওয়ে বসা নাইওরির মুখ

হিজলÑতমালÑতরু গাঙচিল ভরা পুঁটি থইথই পানি পানি ভেলা ঠেলা সুখ!

মোশতাক আহমদ

মোশতাক আহমদ

ন হন্যতে


সাদা নার্সের পোশাকের ভেতরে খেলে যায়

অচিকিৎস্য ক্ষয়রোগির

অকস্মাৎ লিবিডোর চোখ


ঘন্টা-ধরা ওষুধ সুঁই ফোঁড়ানো

স্যালাইন সাকশন অক্সিজেন

ডাক্তারের গম্ভীর রাউন্ড শেষে

আরেকটি সহজ মৃত্যু


তবুও অকস্মাৎ লিবিডোর চোখ

সাদা পোশাকের রমণীর

ন হন্যতে হন্যমান শরীরে



এবার পাহাড়ে


সমুদ্র ক্লিশে মনে হয়, ব্যবহৃত ব্যবহৃত;

এ যাত্রা পাহাড়ে চলো

এই মন্ত্র বেজে উঠলো যানজটের মধ্যপ্রদেশে

বিকেল সাড়ে পাঁচটায়।


কিছু পরে খোলা হাওয়ায়

মন্ত্রের মুখোশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো

দূরতমা ঝরনার গান।


সড়কদ্বীপের চকচকে ফোয়ারার উপহাস

রং করা বুটজুতো-পরা বৃক্ষের সারি

অযান্ত্রিক-প্রায় সরীসৃপ-যানজট

ঊর্ধশ্বাস-হাজিরার ক্ষমাহীন পরিসরগুলো

উপেক্ষায় ঝাপসা;


পাহাড় ডাকছে এবার।